ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

লাখ টাকার চাকরি ছেড়ে আমবাগানে কোটিপতি

author
Reporter

প্রকাশিত : Feb 15, 2026 ইং 111 বার পড়েছে
ছবির ক্যাপশন:
ad728

ভয়েস ডেস্ক

হাড়িভাঙা, আম্রপালি, মিশ্রিভোগ, বারি-৪, ফজলিসহ বিভিন্ন প্রজাতির তিন হাজার গাছের আমের বাগান আছে সেলিমের

হাড়িভাঙা, আম্রপালি, মিশ্রিভোগ, বারি-৪, ফজলিসহ বিভিন্ন প্রজাতির তিন হাজার গাছের আমের বাগান আছে সেলিমের

উন্নত জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য লন্ডন গিয়েছিলেন। পড়াশোনা শেষে উচ্চ বেতনের চাকরিও পেয়েছিলেন। জীবন চলছিলো স্বপ্নের মতোই। হঠাৎ বাবার মৃত্যু ঘুরিয়ে দিয়েছে পথ। দেশে ফিরে প্রত্যন্ত গ্রামে গড়েছেন ‘রাও ফার্ম ফ্রেশ’ অ্যাগ্রো ফার্ম। সেখান থেকে প্রতি মাসে আয় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। তার প্রতিষ্ঠানে অনেকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাকে দেখে অনেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

এমনই এক সফল উদ্যোক্তা সেলিম সরকার। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের কাতলমারি গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে তিনি।

কাতলমারি গ্রামে প্রায় ১৩ একর জমির ওপর গড়েছেন বিভিন্ন প্রজাতির আম, ড্রাগন, মালটার বাগান ও নার্সারি। পাশাপাশি রয়েছে গরু, গাড়ল ও ভেড়ার খামার। এছাড়া রয়েছে চিনিগুঁড়া ধান ও সরিষার আবাদ। সেলিমের ফার্মে কর্মসংস্থান হয়েছে ৪৫ জন যুবকের।

সেলিম সরকারকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিলো বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সেখানে চাকরি নিয়ে বসবাসের। সে লক্ষ্যে ২০০৭ সালে সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ শেষ করে ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমাই। লন্ডনের বেডফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করি। এরপর ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) কোম্পানিতে মাসে তিন লাখ টাকা বেতনে অ্যাকাউন্ট্যান্ট পদে যোগ দিই। বিদেশে যখন স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পথে, তখন ২০১২ সালে বাবা মৃত্যুবরণ করেন। বাবার মৃত্যুর পর চলে আসি গ্রামের বাড়ি। এরপর মায়ের অনিচ্ছায় আর ফেরা হয়নি। সেসময় ঠিক করি গ্রামেই এমন কিছু করবো; যা দিয়ে বিদেশের চেয়ে বেশি আয় করা যায়। সে উদ্দেশ্য নিয়ে ২০১৪ সালে প্রথমে শুরু করি গরুর ফার্ম।

তিনি বলেন, কিছুদিন পর নিজেদের ১০ একর জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে হাড়িভাঙা, আম্রপালি, মিশ্রিভোগ, বারি-৪, ফজলিসহ বিভিন্ন প্রজাতির তিন হাজার গাছের আমের বাগান গড়ে তুলি। এরপর ড্রাগন, মালটা ফলের বাগান তৈরি করি। ২০১৭ সালে আমবাগানে প্রথম ফলন হয়। প্রথমবার ফলনের পরিমাণ খুব কম ছিলো। সিদ্ধান্ত নিই পাইকারি ফল ব্যবসায়ীদের কাছে বাগানের আম বিক্রি করে দেবো। কিন্তু পাইকারি ফল ব্যবসায়ীরা পুরো বাগানের আম সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকায় কিনতে চান। এতে চরম হতাশ হই। বাগান নিয়ে ঠিক কি করবো, তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। কৌতূহলবশত বাগান নিয়ে ফেসবুকে লাইভ শুরু করলাম। কিছুদিন লাইভ করার পর ফেসবুকের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি আম কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। যে আমবাগান পাইকারি ব্যবসায়ীরা পাঁচ হাজার টাকা দাম বলেছিলেন; সেই বাগান এক লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করলাম। মূলত তখনই ভাগ্য বদলে যায়। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সরাসরি আমার ফার্মে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করবো। পরের বছর ২০১৮ সালে ১৮ লাখ টাকার আম, ড্রাগন এবং মালটা বিক্রি করি। গত বছর ৫০ লাখ টাকার আমসহ অন্যান্য ফল বিক্রি করেছি। চলতি বছর এক কোটি টাকার আমসহ অন্যান্য ফল বিক্রি করবো, আশা করছি।

সেলিম আরও জানান, তার বিক্রি করা ফল খেয়ে ক্রেতারা ওসব ফলের গাছের খোঁজ করেন। সেই তাগিদ থেকে ২০১৮ সালে নার্সারি করেন। গত বছর তিনি পাঁচ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ গাছের চারা বিক্রি করেছেন। গরুসহ অন্যান্য গবাদিপশু বিক্রি করে গত বছর আয় করেছেন পাঁচ লাখ টাকা। আসছে কোরবানির ঈদে ৪০টি গরু বিক্রির টার্গেট নিয়েছেন সেলিম।

রাও ফার্ম ফ্রেশের স্বত্বাধিকারী সেলিম সরকার জানান, সততাই তার সফলতার মন্ত্র। তার প্রায় সব গ্রাহক অনলাইনের। প্রতিনিয়ত অনলাইনে গ্রাহকরা যেভাবে প্রতারিত হচ্ছেন, সে জায়গায় রাও ফার্ম ফ্রেশ শতভাগ সততার সঙ্গে গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহ করছে। ফলে গ্রাহকরাই এখন রাও ফার্ম ফ্রেশের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে রাও ফার্ম ফ্রেশ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

সেলিমের আমবাগানের শ্রমিক মো. সাজু মিয়াকে জানান, সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত আমসহ অন্যান্য ফল উৎপাদন করা হয়। বাগানের উৎপাদন এবং সফলতায় আশপাশের ব্যক্তিরা বাগান করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। ফার্মের ফলে অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানে কাজ করে যে বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার যেমন ভালোভাবে চালাতে পারছি; তেমনি ছেলেমেয়েকে পড়ালেখা শেখাতে পারছি। খামারের কারণে আমাদের অনেক উপকার হয়েছে।

সেলিমের গরুর খামারে কর্মরত দিলীপ কুমারকে জানান, খামারে আধুনিক পদ্ধতিতে গরু লালন-পালন করা হচ্ছে। কোরবানিকে সামনে রেখে উন্নতমানের খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে গরুকে মোটাতাজা করা হচ্ছে।

রাও ফার্ম ফ্রেশ ঘুরে দেখা গেছে, গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে সরিষা ভাঙার ঘানি, চিনিগুঁড়া চালের আবাদ ও সরিষার মধু উৎপাদন করছেন শ্রমিকরা।

রাও ফার্ম ফ্রেশের অনলাইন মার্কেটিং ম্যানেজার মো. ইমন হোসেনকে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ের ফলে দ্রুত সফলতা পেয়েছি আমরা। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শুধু দেশেই নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিয়ত পণ্যের অর্ডার পাচ্ছি। বর্তমানে রাও ফার্ম ফ্রেশের ফেসবুক ফলোয়ার এক লাখ ৫৫ হাজার এবং ইউটিউবের সাবস্ক্রাইবার ১৬ হাজার ৫০০ জন। তাই রাও ফার্ম ফ্রেশ উৎপাদিত ফসল বিক্রির পাশাপাশি ফেসবুক এবং ইউটিউব থেকেও আয় করছে। গ্রাহক সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে আমরা দায়বদ্ধ।

মধ্যপাড়া কলেজের আইসিটি বিভাগের প্রভাষক মো. জাকারিয়াকে জানান, সেলিমের রাও ফার্ম ফ্রেশের সফলতায় এলাকার শিক্ষিত যুবকরা উৎসাহিত হচ্ছেন। আমিও এ বছর আমবাগান ইজারা নিয়ে সফলতা পেয়েছি। সেলিমকে দেখে উদ্যোক্তা হওয়ার কথা ভাবছি।

নবাবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে জানান, রাও ফার্ম ফ্রেশ প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। সততা এবং ইচ্ছা থাকলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সফলতা অর্জন করা যায়। তার বাস্তব উদাহরণ রাও ফার্ম ফ্রেশ। কৃষি বিভাগ রাও ফার্ম ফ্রেশকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে চলেছে।


সূত্র- বাংলা ট্রিবিউন



নিউজটি আপডেট করেছেন : Reporter

কমেন্ট বক্স
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ভয়েস অফ কুমিল্লা
সকল কারিগরী সহযোগিতায় A2SYS