ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা

author
Reporter

প্রকাশিত : Mar 13, 2026 ইং 186 বার পড়েছে
ছবির ক্যাপশন:
ad728

মাছুম মিল্লাত মজুমদার 

বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। এটি বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের প্রথম স্থাপিত কলেজ।রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায় ১৮৯৯সালের ২৪ নভেম্বর কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন।প্রথমে তিনি (১৮৮৩সাল)রায় এন্ট্রাস স্কুল স্থাপন করেন। ১৮৮৮ সালে মহারানী ভিক্টোরিয়ার “জুবিলী জয়ন্তী” স্মারক চিহ্ন স্বরূপ ভিক্টোরিয়া স্কুল নামকরণ করা হয়।বতর্মানে এটি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল নামে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানটিই পরবর্তীতে “ভিক্টোরিয়া কলেজ” নাম ধারণ করে। প্রকৃতপক্ষে আনন্দ চন্দ্র রায় ও তাঁর ভ্রাতা সতীশ চন্দ্র রায়ের উদ্যোগেই কলেজটি স্থাপিত হয়েছিল। রায় এন্ট্রাস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক ছিলেন সতীশ চন্দ্র রায় (বি.এ কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ)। তারপর কিছুদিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন প্রখ্যাত লোকসাহিত্য বিশারদ আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন।পরবর্তীতে সত্যেন্দ্র নাত বসু দায়িত্ব পালন করেন। কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি কলেজের  প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

বিগত ১২১ বৎসরব্যাপী বাংলা প্রদেশ এবং বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি বিকাশে ভিক্টোরিয়া কলেজ অন্যতম পথ-প্রদশর্কের ভূমিকা পালন করে আসছে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৭  এর দেশভাগ,  ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ৬দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুথ্থান, ৭০-এর নির্বাচন, ৭১-এর মহান স্বাধীনতা আন্দোলনসহ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায়ের র্পূবপুরুষের পরিচয়ঃ

আনন্দ চন্দ্র রায়ের র্পূবপুরুষ চতুর সিংহ চৌহান ভারতের রাজস্থান থেকে আনুমানিক ১৭৬৪ সালে এদেশে আগমন করেন।তারপর লাকসামে (পশ্চিমগাও) স্থায়ী হন। চতুর সিংহ সামান্য অর্থ সংগ্রহ করে লগ্নির ব্যবসা শুরু করেন।তাঁর পুত্র তিলক চন্দ্র সিংহ পশ্চিমগাওের জমিদার আহম্মেদ আলী সাহেবের জমিদারী স্টেটে জমাদারের চাকুরি লাভ করেন। অল্প দিনেই জমিদারের আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। একদিকে পিতার ব্যবসা অন্যদিকে জমিদারের আনুকুল্যে নিজেই হোমনাবাদ পরগণার (লাকসাম)গোবিন্দপুর মৌজা ক্রয় করেন।তারপর গোবিন্দপুর গ্রামে এসে জমিদার বাড়ি স্থাপন করেন।তার পুত্র ও প্রপৌত্রের আমলে এ তালুকদারী ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হয়ে কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে এবং বিশাল জমিদারী এস্টেটে পরিণত হয়।তিলক চন্দ্র সিংহের দুই পুত্র- ১. রামদুলাল রায় ২. গোপাল কৃষ্ঞ রায়। গোপাল রায় নিঃসন্তান ছিলেন। রামদুলাল রায়ের ৬ পুত্র সন্তানের মধ্যে  বড় দু’জন  আনন্দ চন্দ্র রায় ও সতীশ চন্দ্র রায়।

প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাঃ 

ভিক্টোরিয়া কলেজের একজন ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে রায় পরিবারের প্রতি একধরণের কৌতুহল ও দায়বদ্ধতা রয়েছে।ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করে রায় পরিবার যে অসামান্য অবদান রেখেছেন তা আমরা সকলেই কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করি। ইতিপূবে ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ তিতাস চৌধুরি (বিশিষ্ট লেখক) ভিক্টোরিয়া কলেজ নিয়ে একটি মূল্যবান গ্রন্থ লিখেছেন (কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ:এ যুগের কিংবদন্তি), এডভোকেট গোলাম ফারুক (লেখক ও গবেষক) একটি প্রবন্ধ লিখেছেন , মোঃ আবদুল আউয়াল হেনা (লেখক) রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায় ও তাঁর পরিবারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখেছেন। আনন্দ চন্দ্র রায়ের বংশধরদের খুজে বের করার চেষ্টা ওনারা করেছেন কিন্তু কেউ তাঁর পরিবারের সন্ধান পাননি। আমার সৌভাগ্য যে, আমি প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সন্ধান পেতে সক্ষম হয়েছি। 

প্রতিষ্ঠাতা পরিবারকে খুজে পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাকে যিনি সাহায্য করেছেন তিনি হচ্ছেন আমার পিতা জামাল আহমেদ মজুমদার। বাবার সহপাঠী ছিলেন সুশান্ত সিংহ রায় (বিলোনিয়া),যিনি আনন্দ চন্দ্র রায়ের ছোট ভাই প্রবোধ সিংহ রায়ের নাতি।তারপর সুশান্ত রায়ের মাধ্যমে সত্যজিত রায়ের (আগরতলা)সাথে পরিচয় যিনি রায় বাহাদুরের ছোট ভাই সতীশ চন্দ্র রায়ের নাতি।সত্যজিত রায় আমাকে কলকাতা পাঠালেন ওনার দিদি নন্দিতা রায়ের কাছে। নন্দিতা রায় পাঠালেন হুগলীতে (উত্তরপাড়া)যেখানে আনন্দ চন্দ্র রায়ের পরিবার বাস করেন। তারপর অশোক সিংহ রায়ের সাথে পরিচয় যিনি আনন্দ চন্দ্র রায়ের প্রদৌহিত্র (চর্তুথ পুরুষ)। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বেশ কয়েকবার আগরতলা, কলকাতা, হুগলী যাতায়াত করে রায় পরিবারের প্রায় সবাইকে খুঁজে পেলাম।বিষয়টি খুব সহজ ছিলনা , লেখার পরিসর বেড়ে যাবে তাই সংক্ষেপে উল্লেখ করলাম।

আনন্দ চন্দ্র রায়ের উত্তর পুরুষঃ

আনন্দ চন্দ্র রায়ের কোন পুত্র সন্তান ছিলনা, একমাত্র কন্যা সন্তান লাবণ্য দেবী চৌধুরাণী।১৯০৮ সালে বিয়ে হয় হুগলীর বড় ভূস্বামী কমলিনীকান্ত সিংহ রায়ের সাথে।কমলিনীকান্ত হুগলী মহসিন কলেজ থেকে স্নাতক পাস করে সাব-রেজিস্টার পদে কুমিল্লায়  যোগদান করেন।লাবণ্য প্রভার ৭ ছেলে, ১ মেয়ে। ১ ছেলের বউ এখনও বেঁচে আছেন।বড় ছেলে অজিত সিংহ রায় (বি.এল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) নানার (আনন্দ চন্দ্র রায়) মৃত্যুর পর জমিদারির হাল ধরেন।অজিত সিংহ রায়ের ৪ মেয়ে ১ ছেলে।মেয়েদের নাম-১. জয়শ্রী রায় (উত্তরপাড়ায় আছেন) ২. গীতশ্রী রায়(উত্তরপাড়ায় আছেন) ৩. কাবেরী রায় (কলকাতার বেহালায় আছেন)৪. অনুরাধা রায়(কানাডায় থাকেন)। সবার ছোট প্রকৌশলী অশোক সিংহ রায়(কলকাতার দমদমে থাকেন)।     

প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্যদের ভিক্টোরিয়া কলেজে আগমনঃ  

সতীশ চন্দ্র রায়ের নাতি সত্যজিত রায় প্রথম কলেজে আসেন ২০১৮ সালে। আমার সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরে অধ্যক্ষ স্যারের আগ্রহে তাঁর পরিবারকে কলেজে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্ভ্যথনা জানানো হয়। মধ্যাহ্নভোজের পর অধ্যক্ষ মহোদয়সহ লাকসাম গোবিন্দপুর (জমিদার বাড়ী) ঘুরে আসি।আমাদের সাথে আরও ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি জনাব মহিউদ্দিন মোল্লা। বিধ্বস্ত একটি দালান আর একটি তোরণ ছাড়া জমিদার বাড়ীর কিছুই আর নেই।এরপর থেকে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের অনেকেই আমাকে ফোন করে জানালেন ওনারা কলেজে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। এভাবে কলেজের সাথে রায় পরিবারের সেতুবন্ধন গড়ে উঠলো।

সুরণ্জন সিংহ রায় ভারতের মহারাষ্ট্রের পুণে শহরে থাকেন। তিনি আমার সাথে যোগাযোগ করে ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে সস্ত্রীক কলেজে আসেন।ওনি আনন্দ চন্দ্র রায়ের ৫ম নাতি রজত সিংহ রায়ের ছেলে। কলেজ প্রশাসন ওনাদের অর্ভ্যথনা জানান। যথারীতি আমার উপর দায়িত্ব পরে গোবিন্দপুরে নিয়ে যাওয়ার।

 তারপর ফেব্রুয়ারী মাসের ২৩ তারিখ আসেন রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায়ের বড়নাতি জমিদার অজিত সিংহ রায়ের পুত্র অশোক সিংহ রায় ও তাঁর পুরো পরিবার। উত্তরীয় পরিধান, ক্রেস্ট প্রদানের মাধ্যমে অর্ভ্যথনা জানানো হয়। যথারীতি আমি গোবিন্দপুরে নিয়ে গেলাম।এছাড়াও কলেজে এসেছেন আনন্দ চন্দ্র রায়ের ৪থ নাতি মোহিত চন্দ্র রায়ের মেয়ে মধুশ্রী রায় ও ওনার স্বামী গৌতম রায়।

ওনারা সকলেই যথেষ্ঠ প্রীত হলেন এবং কৃতজ্ঞতা জানালেন। আমরাও প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদ্যসদের কাছে পেয়ে ধন্য হলাম। 

কলেজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পুনঃউদযাপনঃ

কলেজ প্রতিষ্ঠার তারিখ নিয়ে বির্তর্ক রয়েছে।তিতাস চৌধুরি ( অধ্যাপক আবু তাহের ভূঁইয়া)উল্লেখ করেছেন ২৪ সেপ্টেম্বর ১৮৯৯।তিনি আরো উল্লেখ করেন ,“আগে প্রতি বছর ২৪ সেপ্টেম্বর কলেজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও ২৪ নভেম্বর কলেজের প্রতিষ্ঠাতার জন্মবার্ষিকী জাকজমকের সাথে পালন করা হতো।এবং তা সম্ভবত অধ্যক্ষ আখতার হামিদ খান (১৯৫৫-১৯৫৮)পযর্ন্ত চালু ছিল।”

এডভোকেট গোলাম ফারুক লিখেছেন,“১৯৯৯ সনে কলেজের শতবষ অনুষ্ঠান করতে যেয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠার সঠিক তারিখ নিরূপণের প্রশ্ন আসে ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান ওল্ড ভিক্টোরিয়ান্সের সামনে।কলেজের পুরানো দলিল,কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়

যে,১৮-১০-৪৯খৃ:কলেজের এডভাইজারি কাউন্সিলের সভার কার্যবিবরণরি ৭নং অনুচ্ছেদে দেখা যায় যে, কলেজের ৫০ বছর পূর্তিতে সুবর্ণ জয়ন্তী পালন উপলক্ষে ২৫-১১-৪৯ খৃ: থেকে ২৭-১১-৪৯ খৃ: পযর্ন্ত কর্মসূচী গ্রহণ করা হয় এবং ব্যয় বরাদ্দ হিসাবে ১৫০০/ টাকা মঞ্জুর করা হয়।এখানে আরো উল্লেখ্য যে, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ সত্যেন্দ্র নাথ বসুর কলেজে যোগদানের তারিখ ২৪-১১-৯৯ এবং কলেজ প্রতিষ্ঠাতা তাঁর জন্মতারিখটিকে চিরন্তণী করে রাখার জন্য এই মহৎ প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠা তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন ২৪ নভেম্বর ১৮৯৯খৃ:।”

১৯৯৯ সনের পর আর প্রতিষ্ঠাবাষির্কী উদযাপিত হয়নি।  রায় পরিবারের সাথে পরিচয় এবং কলেজের সাথে তাঁদের সেতুবন্ধন সূচিত হওয়ার পর তৎকালীন অধ্যক্ষ মহোদয়কে প্রতিষ্ঠাবাষির্কী উদযাপনের অনুরোধ করি। অধ্যক্ষ মহোদয় সানন্দে রাজী হলেন। তারপর থেকে কলেজ প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১৮ সন থেকে প্রতিষ্ঠাবাষির্কী পুনরায় উদযাপিত হচ্ছে।  

তথ্যসূত্রঃ প্রাথমিক তথ্য 

ন্দিতা রায়ের (সতীশ চন্দ্র রায়ের নাতনী) সাক্ষাৎকার,(একাধিকবার) কলকাতা, 

# সত্যজিত রায়ের( সতীশ চন্দ্র রায়ের নাতি) সাক্ষাৎকার, ,(একাধিকবার)  আগরতলা, 

# অশোক সিংহ রায়ের (আনন্দ চন্দ্র রায়ের প্রদৌহিত্র)সাক্ষাৎকার, ,(একাধিকবার) কলকাতা,

মাধ্যমিক তথ্য    

# কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ: এ যুগের কিংবদন্তী, তিতাস চৌধুরি।

# কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট, এডভোকেট গোলাম ফারুক।

# ভুলি নাই জনক তোমায় ভুলি নাই, আব্দুল আউয়াল হেনা।


লেখকঃ সহকারি অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা।

                                       




নিউজটি আপডেট করেছেন : Reporter

কমেন্ট বক্স
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ভয়েস অফ কুমিল্লা
সকল কারিগরী সহযোগিতায় A2SYS