কান্দিরপাড়, কুমিল্লা | | বঙ্গাব্দ

পঙ্গুত্ব জয় করে স্বাবলম্বী কৃষক বিল্লাল, পাশে দাঁড়ালেন প্রশাসন

author
Reporter

প্রকাশিত : Feb 12, 2021 ইং
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক

দুই পা নেই, স্ক্রাচে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। তবুও জীবনযুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়ছেন চাঁদপুরের কৃষক বিল্লাল হোসেন গাজী। তিনি ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের মদনেরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা।

প্রায় এক যুগ আগে চর এলাকায় ধান রোপণের কাজে গিয়ে ভাঙা শামুক পায়ে ঢুকে যায়। ধীরে ধীরে ক্ষতস্থানে পচন ধরে। কিছুদিন পর কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন তিনি। দুই বছর চিকিৎসা নিয়েও কোনো উন্নতি হয়নি। বাধ্য হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে পা কেটে ফেলতে হয় বিল্লালের।

চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে তার। একপর্যায়ে ঘরের পাশে সামান্য একটু জায়গায় স্বল্প পরিসরে কৃষি আবাদ শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে আবাদি জমির পরিমাণ বাড়িয়েছেন। সেই কাজেই এখন স্বচ্ছল বিল্লাল। তিনি দুই একর জমিতে বর্গাচাষ করছেন। জীবন সংগ্রামে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সাহস ও সহযোগিতা করছেন তার স্ত্রী আমেনা বেগম।

অবশেষে প্রতিবন্ধী কৃষক বিল্লাল হোসেন গাজীর পাশে দাঁড়ালেন চাঁদপুর জেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ।

এসময় তাকে নগদ ২০ হাজার টাকা, সমাজসেবা অধিদফতরের তরফ থেকে প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা, দগ্ধ সেবার আওতায় নগদ পাঁচ হাজার টাকা ও ২৫ হাজার টাকা ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও চিকিৎসাসেবা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন সিভিল সার্জন ডা. সাখাওয়াত উল্লাহ এবং কৃষিকাজে সকল সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জালাল উদ্দীন।

স্ত্রীর সহযোগিতায় জমিগুলোতে মৌসুমি নানা জাতের সবজি আবাদ করেন বিল্লাল। যার মধ্যে রয়েছে- টমেটো, আলু, শাক, মুলা, আখসহ নানা মৌসুমি শস্য। বর্তমানে তিনি আখ, টমেটো ও আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সংসারে তার স্ত্রী, ৪ ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে জাহাঙ্গীর গাজী (৩০) ঢাকায় মাছের ব্যবসা করেন। তৃতীয় ছেলে আখের গাজী (২৫) ঢাকায় একটি বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। অন্য দুই ছেলে জাকির গাজী (২৭) ও হোসেন গাজী (২১) এলাকায় মোটর মেকানিকের দোকানে কাজ করেন। একমাত্র মেয়ে ফাতেমা আক্তারকে বিয়ে দিয়েছেন।

বিল্লাল গাজী জানান, চিকিৎসা শেষে যখন বাড়িতে ফিরে আসেন তখন সংসার চালাতে তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। কারণ ছেলেরা তখন ছোট। তাছাড়া ছেলেরা কাজ করে কতদিন চালাবে তাকে। তাই এই চিন্তা থেকে নিজে কিছু করে সংসার চালানো শুরু করেন তিনি। কিন্তু টাকার অভাবে কোনো দোকান দিতে না পারায় কৃষিকাজের কথা চিন্তা করেন তিনি।

এরপর মানুষের জমি বর্গা নিয়ে সেই জমিতে চাষাবাদ শুরু করেন। এভাবেই কাটিয়ে দিয়েছেন ১২ বছর। কৃষি কাজ করে সংসারের পাশাপাশি নিজের খরচ চালাতে পারছেন সেটাই তার কাছে বড় বিষয়।

তিনি বলেন, ছেলেদের ওপর নির্ভর থাকলে এক সময় তাদের কাছে বোঝা হয়ে যেতাম। তাদের এখন সংসার হয়েছে, খরচ বেড়েছে। সেখানে যদি আমিও যোগ হতাম, তাহলে এক সময় তারা বিরক্ত হয়ে যেত। তাই এসব চিন্তা করে নিজে নিজেই কৃষি কাজ করে সংসারের হাল ধরেছি।

হাজী বাড়ির বাসিন্দা আব্দুল রহিম জানান, আমার মামা প্রতিবন্ধী হলেও কখনও ভিক্ষাবৃত্তি বা কারও কাছে হাত পাতেননি। যা করছেন তা নিজের মনের জোরেই করছেন। আমি উনার পরিশ্রমকে সম্মান করি। তবে উনি যদি সরকারের একটু সহযোগিতা পান তাহলে আরেকটু ভালোভাবে চলতে পারবেন।

প্রতিবন্ধী বিল্লাল গাজী বলেন, ‘আমি কোনো প্রতিবন্ধী ভাতা পাই না। পেলে একটু উপকার হত। সরকার যদি আমারে একটু সহযোগিতা করে, আমি প্রতিবন্ধী হয়েও ভালোভাবে চলতে পারব।’

বালিথুবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সফিকুর রহমান বলেন, ‘বিল্লালকে ভাতার ব্যবস্থা করে দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। এছাড়াও ভবিষ্যতে যদি কোনো সহায়তা লাগে আমি তাকে সহযোগিতা করব।’

জেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নরেশ চন্দ্র দাস, আমরা কৃষিকাজে কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা করে থাকি। তবে উনার বিষয়টি আমার জানা ছিল না। যেহেতু তিনি প্রতিবন্ধী তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। প্রয়োজনে তাকে কৃষি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করব।

চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, ‘তিনি জেলা প্রশাসনে আবেদন করলে তাকে ভাতা এবং হুইলচেয়ার প্রদানসহ অন্যান্য সার্বিক সহায়তা প্রদান করা হবে।’


নিউজটি আপডেট করেছেন : Reporter

কমেন্ট বক্স
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ভয়েস অফ কুমিল্লা ডট কম
সকল কারিগরী সহযোগিতায় SoftioLab