
নিজস্ব প্রতিবেদক
আসছে শীতে করোনার ঢেউ বা দ্বিতীয় প্রকোপ বাড়ার আশংকা থাকলেও এই নিয়ে কুমিল্লার বাসিন্দারা যেন আরও বেশি উদাসীন হয়ে পড়েছে। বাস টার্মিনাল কিংবা রেলস্টেশন থেকে গণপরিবহন পর্যন্ত কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। কিছুদিন আগেও এইসব জায়গায় যেটুকু নিয়ম পালন করা হতো, সেইটুকুও এখন উদাও। আর চালক, হেলপার, সুপারভাইজার এবং যাত্রীরা মাস্ক ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ছেন বাসে। এছাড়া কুমিল্লা নগরীতে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও ব্যটারিচালিত অটোরিকশাসহ সব ধরণের গণপরিবহরে বিন্দুমাত্র স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না যাত্রীরা। দুইজনের সিটে গাদাগাদি করে বসছেন ৪/৫ জন। মাস্ক ব্যবহারে রয়েছে উদাসীনতা।
চলমান করোনা মহামারীতে কুমিল্লাসহ সারাদেশেই গণপরিবহন এখন পুরোপুরি স্বাভাবিক। তবে বলা হয়েছে স্বাস্থ্য মেনে যাত্রী পরিবহনের কথা। এছাড়াও বলা হয়েছে সবাইকে মাস্ক ব্যবহারের কথাও। কিন্তু যাত্রীবাহী বাসসহ কুমিল্লার গণপরিবহনগুলোতে চালক, হেলপার ও যাত্রীরা মাস্ক ছাড়াই গলপরিবহনে উঠছেন। রবিবার কুমিল্লার শাসনগাছা, জাঙ্গালিয়া বাস টার্মিনাল এবং নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় ঘুরে এইসব দৃশ্য দেখা গেছে।
এদিকে রবিবার দুপুরে কুমিল্লার রেলওয়ে স্টেশনে গিয়েও দেখা গেল স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং মাস্ক ব্যবহারে যাত্রীরা উদাসীন। সবাই ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন। সচেতনায় নেই কোন সতর্কতা। এই অবস্থা কুমিল্লার বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন মীতে দ্বিতীয় দাফে আবারও যদি করোনা আঘাত আনে তাহলে কুমিল্লাও ব্যাপক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে।
কুমিল্লার লাকসাম রোড কান্দিরপাড় হাফেজ মহিউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি সিএনজি চালিত অটোরিকশা পিছনের সিটে গাদাগাদি করে সস্ত্রীক এবং পরিবারের ৫ সদস্য উঠেছেন। কারও মুখে মাস্ক নেই। স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাচ্চাদের মাস্ক বাসায় রেখে এসেছেন ভুলবশত। নিজের মাস্ক আছে, তবে পকেটে।
এদিকে শাসনগাছা বাস স্ট্যান্ডগুলো গিয়ে দেখা গেল স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। নেই সামাজিক দূরত্ব এবং নেই মাস্কের ব্যবহার। দেশে যে করোনার এখন প্রকোপ রয়েছে, সেটা এখনকার মানুষ ভুলেই গিয়েছে। পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি নেই। শতকরা ৮৫ ভাগ যাত্রীর মুখে নেই মাস্ক।
শাসনগাছা তিশা পরিহনের যাত্রী মূসা যাবেন ঢাকায়। মুখে মাস্ক নেই। তার আশপাশের সিটে বসা সব যাত্রীর মুখেই একই অবস্থা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, পান খেয়েছেন। মাস্ক পড়লে পান খাওয়া সম্ভব হয়না, কারণ মাস্ক নষ্ট হয়ে যায়। তাই ব্যবহার করছেন না। ওই বাসের যাত্রীদের মধ্যে শতকরা ৫/৭ জনের মুখে মাস্ক পাওয়া গেছে।
ওই বাসের এক সচেতন যাত্রী মীর হোসেন জানান, স্বাস্থ্য বিািধ না মেনে যারা বাসে ছড়ছেন তাদের কারণে তারাও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তিনি বলেন, আমি আমার সুরক্ষা যতটুকু করতে পারি সেটা ছাড়া কোন উপায় দেখছিনা।
একই টার্মিনালের পাপিয়া বাসের আরেক সচেতন যাত্রী হাসান মাহমুদ বলেন, দোকানে চারটা মাস্ক বিক্রি হচ্ছে ১০টাকায়। এতো সহজলভ্যে মাস্ক সবাইতো নিচের সচেতনার জন্য ব্যবহার করতে পারে। ১০ টাকা বর্তমান সমাজে কোন বিষয় না।
কুমিল্লা কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আশিকুর রহমান ভূঁইয়া জানান, করোনার প্রথম দিকে মানুষ অনেক সচেতন ছিল। কিন্তু তারা মনে করছে করোনা শেষে পরিবেশ স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু না করোনা এখনও যায়নি। এই মহামারী দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নগরীর জাঙ্গারিয়া বাস টার্মিনালে দেখা দেখে একই দশা। এখানকার উপকূল বাসের টিকেট কাউন্টারের ম্যানেজারের মূখে মাস্ক নেই। স্বাভাবিক অবস্থার মতো যাত্রীদের সাথে লেনদেন করছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা স্বাস্থ্যবিধি পরোটাই মানছেন। মুখে মাস্ক লাগাতে পারেননি বাসা থেকে আসার সময় আনা হয়নি বলে।
আরেক বাস কাউন্টারের ম্যানেজার কাশেম। বয়স ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে। তার মুখেও মাস্ক নেই। তিনি বলেন, করোনায় আমরা আক্রান্ত হবো না। আক্রান্ত হবে বড় লোকেরা। আমরাতো শ্রমিক, আমরা রোদে পুড়তে পারি আবার বৃষ্টিতে ভিজতেও পারি। আমাদের শরীরে এই রোগ আসবে না।
এদিকে করোনা মহামারী সময়ে গণপরিবহন সীমিত পরিসরে খুলে দেয়ার পর কুমিল্লার শাসনগাছা, চকবাজার, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এবং জাঙ্গালিয়া বাসস্ট্যান্ডগুলোতে কিছুদিন আগেও টার্মিনালে যাত্রী উঠানোর সময় ছিড়ানো হতো জীবানুনাশক। স্পে করা হতো পুরো গাড়িতে এবং সিটে। কিন্তু এখন তাও হচ্ছে না।
মোয়াজ্জেম হোসেন নামে এক যাত্রী জানান, কোন গাড়িতে কোন স্পের ব্যবস্থা নেই। চালক, হেলপার, সুপারভাইজার কেউ মাস্ক ও পড়েন না।
আলী হোসেন নামে আরও এক যাত্রী জানান, করোনায় পূণরায় পরিবহন চলাচল করার পর যাত্রী উঠার সময় স্পে মেরে নিতেন। আর এখন যাত্রী আসলে প্রথমে বলেন ভাই কিছু লাগবে না তাড়াতাড়ি উঠে পড়েন। ভিতরে গিয়ে নিজের সুস্থ স্বাস্থ্য নিয়ে ঝুঁকিতে পড়ি।
কুমিল্লার বাস মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, করোনার প্রকোপ আবারও বাড়তে শুরু করলে সরকারের সব নির্দেশনা মেনে রাস্তায় নামবে গণপরিবহন। কোন বাস মালিক না শুনলে প্রমাসনকে বলবো তাদের ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি গ্রহণ করবো।
মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিতের বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, যানবাহন এবং গণপরিবহনে মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিত করতে আমাদের সব সময়ে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সামনে করোনা প্রকোপ বাড়তে পারে সেই নির্দেশনা পেয়ে আমাদের কার্যক্রমে আরও জোর দেওয়া হয়েছে।